মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২২ পূর্বাহ্ন
খেলাধুলা ডেস্ক:
‘পেলে ইজ পেলে, আই অ্যাম রোনালদো।’ নিজের সম্পর্কে বলা রোনালদো লুইস নাজারিও লিমার কথাগুলো অন্যরকম এক স্বাতন্ত্র্য নির্দেশ করে। হয়তো সে কারণেই তিনি ‘ফেনোমেনন’। ফুটবল ইতিহাসের সেরা ৯ নম্বরও।
রোনালদোর ক্যারিয়ারে দুটি ভাগ আছে। নিরানব্বইয়ের আগে ও পরে। মাত্র ২৩ বছর বয়সের হাঁটুর ইনজুরি ক্যারিয়ারটাই শেষ করে দিয়েছিল প্রায়। ক্রুজেইরো, পিএসভি আইন্দহোভেন, বার্সেলোনা, ইন্তার মিলান এবং ব্রাজিলের হয়ে ততদিনে ২০০ গোল করে ফেলেছেন। বার্সেলোনার হয়ে এক মৌসুমে ৪৯ ম্যাচে ৪৭ গোল করে তিনি লোককথার পর্যায়ে উত্তীর্ণ। পেলের সঙ্গে লোকে তার তুলনা টানছে। এমন সময়েই হাঁটুর সেই মারাত্মক ইনজুরি। লম্বা সময় মাঠের বাইরে কাটিয়ে ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে খেলেছিলেন আবার রোনালদো। শুধু খেলা নয় ৮ গোল করে ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জেতান। নিজে জেতেন গোল্ডেন বুট। একটু ফুটনোটের মতো বলা উচিত, আধুনিক ফুটবলে এক বিশ্বকাপে ৮ গোল কিন্তু সাধারণ ঘটনা নয়।
ফুটবলবোদ্ধাদের ধারণা ২০০২-এর চেয়ে ১৯৯৮-এর বিশ্বকাপের রোনালদো ছিলেন আরও ভালো। প্রমাণ হিসেবে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ব্রাজিলের সেমিফাইনাল ম্যাচটার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। রোনালদোর ড্রিবল, বডিফেইন্ট আর দৌড় দেখে আইটিভি কমেন্টেটর ব্রায়ান মরিস বলেছিলেন ‘মাঝমাঠের ওপার থেকে রোনালদোকে বল পায়ে দৌড়াতে দেখে স্টেডিয়ামের গ্যালারি প্রজ¦লিত হয়ে উঠেছিল।’ বার্সেলোনার তৎকালীন ম্যানেজার স্যার ববি রবসনের ভাষায়, ‘গ্যালারিতে বিদ্যুৎ তরঙ্গ বয়ে গেল।’ আটানব্বই বিশ্বকাপের ফাইনাল হয়েছিল ব্রাজিল-ফ্রান্সের মধ্যে। দুটি গোল করেছিলেন জিনেদিন জিদান। অসুস্থ শরীর নিয়ে নামা রোনালদোকে মাঠে খুঁজে পাওয়া যায়নি। শোনা যায়, সেই ব্যর্থতার জ্বালায় কোরিয়া-জাপানে প্রতিপক্ষকে কোনো সুযোগ দেননি ফেনোমেনন। ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে দুটি গোল করেছিলেন। অলিভার কান চেষ্টা করেও থামাতে পারেননি রোনালদোকে।
কথিত আছে বল-পায়ে রোনালদো কয়েকগুণ বেশি জোরে দৌড়াতে পারতেন। জিদান বলেন, ‘যখন রোনালদোর পায়ে বল থাকে তখন মনে হয় সে ঘণ্টায় দুই হাজার মাইল বেগে দৌড়ায়।’ জার্সি ছাড়া বক্সার মনে হতো রোনালদোকে। অসাধারণ বাইসেপ আর প্রশস্ত কাঁধ নিয়ে কীভাবে চকিত হরিণের মতো দৌড়াতেন সেই রহস্য কোনোদিন সমাধান করতে পারেননি রবসন। ফরাসি তারকা মার্সেল দেশাই তো বলেছিলেন, ‘বলের ওপর অমন চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আর কোনো ফুটবলারকে আমি এত জোরে দৌড়াতে দেখিনি। ড্রিবল করতে করতে রোনালদোর এগিয়ে যাওয়া দেখে মনে হতো কোনো ভিডিও গেম দেখছি।’ বার্সেলোনার হয়ে ৪৭ গোল করা মৌসুমে ন্যু ক্যাম্পে রোনালদোর সতীর্থ ছিলেন লুইস এনরিকে। ফেনোমেননকে খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘আমি যত ফুটবলার দেখেছি তার মধ্যে সে ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয়। ওরকম খেলতে আগে কাউকে দেখিনি। এখন আমরা হয়তো মেসিকে দেখি ছয়জনকে কাটিয়ে গোল দিতে। তখন এটা অকল্পনীয় ছিল। রোনালদো তার সময়ে যেমন ছিল শক্তিশালী তেমনি ছিল সেরা।’
১৯৭৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রিও ডি জেনেরিওতে জন্ম রোনালদোর। লাতিন আমেরিকার অন্য দশটা প্রতিভাবানের মতো রাস্তার ফুটবল খেলে বড় হয়েছিলেন। স্কুল ছেড়েছিলেন মাত্র ১১ বছর বয়সে। এরপর ভর্তি হন রামোস ফুটসাল ক্লাবে। প্রথম মৌসুমেই করেছিলেন ১৬৬ গোল। ছেলে সম্পর্কে মা বলেন, ‘স্কুলে যাওয়ার সময় আমি প্রতিদিন তাকে বন্ধুদের সঙ্গে রাস্তায় ফুটবল খেলা অবস্থায় পেতাম। মাসের ত্রিশ দিন একই ব্যাপার দেখে আমি ধরেই নিয়েছিলাম লড়াইটা হেরে গেছি।’
ফুটবল-পায়ে মায়ের জীবন সংগ্রামের লড়াই জিতিয়ে দিয়েছেন রোনালদো। মাত্র ১৬ বছর বয়সে ক্রুজেইরোতে তারকা হয়ে ওঠেন। এরপর পিএসভি তাকে কিনে নেয়। প্রথম মৌসুমে ৪৬ ম্যাচে করেছিলেন ৪২ গোল। এরপর বার্সেলোনা এবং ইন্তার মিলানে দাপিয়ে খেলেছেন। ১৯৯৪ সালে রোনালদোর আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছিল আর্জেন্টিনার বিপক্ষে। চুরানব্বইয়ের বিশ্বকাপ দলেও ছিলেন তিনি। কোনো ম্যাচ খেলার সুযোগ হয়নি। বেবেতো-রোমারিও জুটি সেবার ব্রাজিলকে চ্যাম্পিয়ন করেছিল। আটানব্বইয়ে তিনি দলকে ফাইনালে তুললেও কাপ জেতাতে পারেননি। ২০০২-এ পেরেছিলেন। বিশ্বকাপ ট্রফিতে চুমু দিয়ে বললেন, ‘বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে কী তীব্র ইচ্ছাটাই না ছিল। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে প্রতি মুহূর্তে আমি কেবল ট্রফিটার স্বপ্ন দেখেছি। এটা তুলে ধরার অনুভূতি প্রকাশ করা সম্ভব নয়। প্রথম শিরোপা হাতে নিয়ে চুমু খেতে কেমন লেগেছিল সেটাও বোঝাতে পারব না।’
দুটি বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের সদস্য রোনালদো। চুরানব্বইয়ে তার কোনো ভূমিকা ছিল না। ২০০২-এ তিনিই সর্বেসর্বা। এরপর তার ক্যারিয়ার বেশিদূর এগোতে পারেনি। হাঁটুর ইনজুরি আগেই তাকে অর্ধেক করে দিয়েছিল। যা খেলতেন স্রেফ প্রতিভার জোরে। কিন্তু প্রতিভার সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতা যখন এক হয়ে মিশেছিল রোনালদোয়, তখন তিনি ছিলেন বিশ্ব ফুটবলের অদ্বিতীয় ‘ফেনোমেনন’।
ভযেস/আআ